Gonit Dorshon গণিত দর্শন

Download Edit this record How to cite View on PhilPapers
Abstract
এই নিবন্ধে গণিত সম্পর্কে একাধিক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর কথা আলোচনা করা হয়েছে- এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক বিচারই গণিত-দর্শনের মূল কথা। বিশেষত, প্লেটোবাদ এবং বোধবাদ, এই দুই দৃষ্টিকোণ তাদের দুস্তর ভিন্নতা সত্ত্বেও গণিতের বিশাল ও পরিব্যাপ্ত কাঠামোর ভিতর নিজেদের স্থান করে নিয়েছে, এটির তাৎপর্য অনুসন্ধান করা হয়েছে। গণিতের বিবৃতিগুলি সর্বজনীন ও অমোঘ, তবু তারা নির্বিকল্প নয় - প্লেটোবাদ ও বোধবাদের ইতিহাস এ কথাই বলে। বহু প্রয়াস সত্ত্বেও এদের ভিতরকার আপাত বিরোধের নিরসন হয় নি। এরা দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই ভিন্ন প্রকৃতির স্বীকৃতিগুচ্ছের উপর, কিন্তু এদের প্রতিটিরই যুক্তিপ্রকরণ নিশ্ছিদ্র। আবার এ দুইয়ের ভিতর সাযুজ্যও অনস্বীকার্য - এদের বিবৃতিগুলি পরস্পরের অনুরূপ, আবার এরা যে সব প্রশ্নের সমাধান খোঁজে সেগুলিরও সাদৃশ্য নিবিড়। গণিত কোন অনৈসর্গিক ব্যাপার নয়, এর অবস্থান আমাদের ধারণার জগতে। ধারনার জগৎ গড়ে ওঠে বহির্জগতের উপর ভিত্তি করে, কিন্তু এর বিবর্তন ও গতিপ্রকৃতি এর নিজস্ব। গাণিতিক সত্য ও গাণিতিক বিবৃতির তাৎপর্য আমাদের বোধগম্য হয় কোন অতিলৌকিক অন্তর্দৃষ্টি সহযোগে নয়, আমাদের অনুমান-ক্ষমতা ও হেতু-মনন সহযোগে, যা এক দীর্ঘ ও বিসর্পিল প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি-মননের ক্ষেত্র থেকে উন্নীত হয় সর্বজনীন ধারণার জগতে। গাণিতিক প্রমাণ, এক অর্থে, এক যান্ত্রিক ব্যাপার, এবং এই অর্থেই গণিত স্বতঃপ্রতীত, কিন্ত গাণিতিক ধারণাগুলিতে আমরা পৌঁছই অনুমান-ক্ষমতা সহযোগে, যার অন্যতম অবলম্বন হল ব্যাপ্তি-অনুমান। যৌক্তিক প্রমাণের বিপরীতে, ব্যাপ্তি-অনুমানের কোন সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই, তবু এক দিকে নিশ্ছিদ্র প্রমাণ আর অপর দিকে ব্যাপ্তি-অনুমান কাজে লাগিয়েই মানুষ গড়ে তুলেছে গণিতের জগৎকে, যার অবস্থান বস্তুত আমাদের ধারণার জগতের ভিতরই। গণিতের শুরু সুদূর অতীতে, সেই সময়কার বাস্তব সমস্যাবলীর প্রয়োজন মেটাতে, যেখানে গণিত আর বিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য ছিল না, দুইই ছিল বাস্তব সদর্থক অভিজ্ঞতার সারসংকলন, কিন্তু ক্রমশ দেখা দিল বিভাজন – প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়োজিত হল প্রাকৃতিক জগতের নানান ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে, আর গণিত হয়ে উঠতে থাকল এক স্বতন্ত্র জগতের ব্যাপার – যেখানে প্রাধান্য পেল স্বীকৃতি ও যৌক্তিক নীতি, যেখানে সত্যতা ও যাথার্থ্যের যাচাই হতে থাকল প্রত্যক্ষ প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর নিরীখে নয়, গাণিতিক কষ্টিপাথরে - মানুষ নতুন গাণিতিক সত্যের সন্ধান করল ব্যাপ্তি-অনুমান ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে। গণিত বিবর্তিত হতে থাকল নানান অভ্যন্তরীণ চাহিদার তাগিদে, এক অদৃশ্য অথচ ব্যাপক ও অমোঘ অনুশাসনের নজরদারীতে, যেখানে অনুমান, স্বীকৃতি, বা যৌক্তিক নীতির চয়ন ও প্রয়োগ যথেচ্ছ নয়। ফলত, গণিতের প্রশস্ত কাঠামোটির ভিতর গণিত-চর্চার একাধিক ধারা থাকলেও, এবং তাদের অন্তরালবর্তী দর্শন ভিন্ন হলেও, সেগুলির পদ্ধতি ও লক্ষ্যের ভিতর থাকে প্রগাঢ় সাযুজ্য। গাণিতিক প্রমাণ নিশ্ছিদ্র ও অমোঘ, এ কথাও যেমন সত্য, তেমনই আবার এ কথাও সত্য যে গণিত-চর্চার দুই ভিন্ন ক্ষেত্রে স্বীকৃতিগুলি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, যৌক্তিক নিয়মতন্ত্রে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। শেষ বিচারে কোন নিয়মতন্ত্রই শতকরা একশ ভাগ সুনির্দিষ্ট নয়, কারণ নিয়মতন্ত্র সর্বদাই বহু-স্তরবিশিষ্ট হয়ে থাকে, যেগুলির ভিতর থেকে যায় অকথিত কিছু অংশ, যার নিম্নতম স্তরে থাকে কিছু দৃষ্টান্ত-ভিত্তিক নির্দেশ। স্বীকৃতি ও যৌক্তিক নিয়মতন্ত্রের বিবর্তনেরও এক সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে, এবং সেই ইতিহাসের পথেই আবির্ভূত হয় গণিত-চর্চার একাধিক ভিন্ন ধারা। আর, এই ভিন্নতাই আমাদের বলে দেয়, প্লেটোবাদের দৃষ্টিভঙ্গীর কোন অবশ্যগ্রাহ্য সর্বজনীনতা নেই, কারণ গণিত যদি কোন সুদূর জগতের স্বতঃনির্ধারিত (বা পূর্ব-নির্ধারিত) সত্যের সমাহার হত, তা হলে গণিতের ভিতর ভিন্নতার কোন জায়গাই থাকত না। অবশ্য এই ধরনের ‘যুক্তি’ দিয়ে কোন দৃষ্টিভঙ্গীকে খন্ডন করা যায় না, এবং, বস্তুত, নানান ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর অস্তিত্ব সর্বদাই প্রাণশক্তির সহায়ক। তাই, বোধবাদী দর্শনের যেমন সদর্থক দিক রয়েছে যা আমাদের বলে দেয় যে গণিতের অবস্থান আমাদের ধারণার জগতে, গাণিতিক সত্যের নাগাল আমরা পাই আমাদের বোধবৃত্তি ও মনন-ক্ষমতার সাহায্যে, তেমনই আবার প্লেটোবাদেরও সদর্থক দিক থাকা স্বাভাবিক – বস্তুত, গোয়েডেল-বর্ণিত অন্তর্দৃষ্টির স্বভাব-বাদী ব্যখ্যা গণিতে-দর্শনে খুবই ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারে, এবং চিরায়ত গণিতে গাণিতিক সত্যতা আর যাথার্থ্যের ভিতর যে ব্যবধানের কথা বলা হয় (বোধ-বাদী দর্শন যা স্বীকার করে না) তা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যতা ও যাথার্থ্যের ভিতরকার ব্যবধানের সঙ্গে তুলনীয় একটি উপযোগী ধারণাও হতে পারে। বস্তুত, গাণিতিক সত্যতার নাগাল আমরা পাই ব্যাপ্তি-অনুমানের পথ ধরে, যার কোন সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই, আর তাই সে সত্যতা অনিবার্য নয় – ব্যাপ্তি-অনুমান অনেক সময়ই পথভ্রষ্ট হয়, আর বহু-সংখ্যক ভ্রান্ত অনুমানের ভিতর থেকে যায় সত্যের এক একটি হীরকখন্ড। কিন্তু সত্যতার অভিজ্ঞান হল তার যাথার্থ্য প্রতিষ্ঠা, যা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। সত্যতা আর যাথার্থ্যের ভিতরকার ব্যবধান দর্শন ও মানব-অস্তিত্বের এক গভীর ও অমীমাংসিত (সম্ভবত অমীমাংসেয় ) প্রশ্ন – বোধবাদ যখন এই ব্যবধান অস্বীকার করে তখন সে তার নির্দিষ্ট গন্ডীর ভিতর তা করতেই পারে, কিন্তু প্রশ্নটি তাতে বাতিল হয়ে যায় না। ব্যাপ্তি-অনুমান সংঘটিত হয় অনেকটাই আমাদের অগোচরে, অচেতন মনের ক্রিয়ায়, যা সম্ভব হয় বিবর্তনের পথে উদ্ভূত অনুমান-ক্ষমতা সহযোগে। এটিই সম্ভবত গোয়েডেল-বর্ণিত অন্তর্দৃষ্টির স্বভাব-বাদী ব্যখ্যার এক অন্যতম সূত্র। ব্যাপ্তি-অনুমানে আমাদের সহায়ক হয় বহুবিধ হ্রস্ব-বোধ । গাণিতিক জর্জ পোলিয়া গণিত-চর্চায় ব্যাপ্তি-অনুমানের এবং নানাবিধ গাণিতিক হ্রস্ব-বোধের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলেছেন। ব্যাপ্তি-অনুমান এবং হেতু-মননের ক্ষেত্র হল আমাদের ধারণার জগৎ, যাকে একটি গাণিতিক মন্ডলের অনুরূপ তন্ত্র বলে ভাবা যায়। এই বিস্তৃত ও জটিল মন্ডলের ভিতর চলে অসংখ্য ধারণার অতি জটিল বিবর্তন – এরই ভিতর অবস্থিত গাণিতিক ধারণার জগৎ । ধারণাগুলি বস্তুত এক একটি সম্পর্কের দ্যোতক। প্রাকৃতিক জগতের অভ্যন্তরীণ নানান জটিল সম্পর্কের সূত্র ধরে গড়ে ওঠে নানান ধারণা, আবার এইসব ধারণার ভিতরও স্থাপিত হয় নানান সম্পর্ক – অসংখ্য বিচিত্র সমন্বয়ের ভিতর দিয়ে গড়ে ওঠে অভিনব ধারণাপুঞ্জ। ধারণা-মন্ডলে অভিনব ধারণার আবির্ভাব হয় কী ভাবে, মনস্তত্ত্বে ও কৃত্রিম-মনন বিজ্ঞানে তা অনেকটাই অজানা, কিন্তু তা সম্ভবত পুরোপুরি অজ্ঞেয় নয় – এই জানার তাগিদ দর্শনকে যুগিয়ে দেয় স্বভাব-বাদ। স্বভাববাদের দৃষ্টিকোণ অনুসরণ করে কেউ কেউ গণিতের সঙ্গে বিজ্ঞানের অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা বলেছেন। গণিতের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক বোঝা সহজসাধ্য নয় – এ প্রসঙ্গে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষত, গণিতের জগৎটি বিজ্ঞান-অনুসন্ধানের জগৎ থেকে স্বতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও গণিত কিভাবে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এত উপযোগী ও কার্যকর, সেটি এক মৌলিক প্রশ্ন। তবে গণিত ও বিজ্ঞান পরস্পরের থেকে স্বতন্ত্র হলেও, উভয়েরই অবস্থান কিন্তু আমাদের ধারণার জগতে। সেখানে বিজ্ঞানের কাজ হল প্রাকৃতিক জগৎ থেকে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের কষ্টিপাথরে আমাদের ধারণাগুলিকে যাচাই করা, আর গণিতের কাজ হল প্রাকৃতিক জগতের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কগুলি এবং আমাদের ধারণার জগতের সম্পর্কগুলিকে এক স্বতন্ত্র নিরীখে দেখা, ও তা থেকে ক্রমশ নতুন নতুন সম্পর্ক বিষয়ে ধারণা তৈরী করা, যেগুলি মেনে চলবে গণিতের অমোঘ অনুশাসন। বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগতের ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করার জন্য তৈরী করে সে জগতের এক একটি প্রতিরূপ, যেগুলি আবার ক্ষেত্রবিশেষে কোন এক প্রস্থ গাণিতিক সত্যতারও বাহক হতে পারে (স্মরণ করা যেতে পারে, কোন একগুচ্ছ গাণিতিক বিবৃতির সত্যতা নির্ধারিত হয় এক বা একাধিক সমাহারের সাপেক্ষে, যেগুলি ওই সব বিবৃতির ক্ষেত্রে গাণিতিক প্রতিরূপের কাজ করে)। বিশ্বজগতের অভ্যন্তরীণ বহুবিধ বিচিত্র সম্পর্কের ভিতর বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ হল সাদৃশ্যের সম্পর্ক। পোলিয়া গাণিতিক চিন্তায় সাদৃশ্য-সন্ধানের উপর জোর দিয়েছিলেন। বস্তুত, সাদৃশ্য সন্ধানের মাধ্যমেই আমাদের ধারণার জগতে নানাবিধ বিমূর্তকরণ প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। সম্পর্ক ও সাদৃশ্য, এই দুইই হল ধারণার বিচিত্র-জটিল বিবর্তনের দুই প্রধান উপাদান। আার, এই দুই উপাদানকেই প্রধান উপজীব্য করে গড়ে উঠেছে গাণিতিক প্রকার-তত্ত্ব । প্রকার-তত্ত্ব গণিতকে দিয়েছে এক নতুন অবয়ব – এক বিপুল প্রশস্ততা, যা গণিতের বহুবিধ স্থাপত্যকে গ্রথিত করেছে এক বিস্তৃত সম্পর্কের জালকে। প্রকার-তত্ত্বে গণিতের ‘ভিত্তি’ কথাটির তাৎপর্য বদলে গিয়েছে অনেকটাই – সমাহার তত্ত্ব যেমন সমাহার-গুলিকেই গণিতের ‘মৌলিক’ উপাদান রূপে চিহ্নিত করে, প্রকার-তত্ত্ব তা করে না - সব রকম গাণিতিক স্থাপত্যকেই এক আসনে বসায় প্রকার-তত্ত্ব – সব রকম স্থাপত্য সহযোগেই গঠিত হতে পারে প্রকার-তন্ত্র । আলেকজান্ডার গ্রোতেন্ডিক বীজগণিতীয় জ্যামিতিতে (এবং, বস্তুত, গণিতের এক বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে) সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছিলেন প্রকার-তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়ে। প্রকার-তত্ত্ব, এক অর্থে, আমাদের ধারণার জগতের নানা বিচিত্র সম্পর্কেরই গাণিতিক প্রতিফলন। প্রকার-তত্ত্বের পথ ধরেই হয়ত আগামী দিনে গড়ে উঠবে গণিতের এক সমৃদ্ধ দর্শন।
PhilPapers/Archive ID
LAHGD-2
Revision history
Archival date: 2020-02-11
View upload history
References found in this work BETA

No references found.

Add more references

Citations of this work BETA

No citations found.

Add more citations

Added to PP index
2020-02-11

Total views
7 ( #47,149 of 46,191 )

Recent downloads (6 months)
7 ( #46,075 of 46,191 )

How can I increase my downloads?

Downloads since first upload
This graph includes both downloads from PhilArchive and clicks to external links.